লিখেছেন: কে.এস. অজয় (KS Ajay) | ২৮ ফেব্রুয়ারি
প্রতিদিন আমার ইনবক্সে, ফেসবুক পেজে কিংবা সরাসরি দেখা হলে নতুনদের কাছ থেকে একটি কমন প্রশ্ন আমি অহরহ পাই। প্রশ্নটি আপাতদৃষ্টিতে খুব সাধারণ মনে হলেও, এর গভীরতা অনেক। আপনারা প্রায়ই জানতে চান—
“ভাইয়া, ফ্রিল্যান্সিং শিখব, কিন্তু কোন কাজটা শিখব?”
অথবা,
“কোন কাজের চাহিদা এখন মার্কেটে সবচেয়ে বেশি এবং কোন কাজ শিখলে আমি দীর্ঘদিন মার্কেটে টিকে থাকতে পারব?”
শুনতে প্রশ্নটা খুবই সহজ। কিন্তু সত্যি বলতে উত্তরটা মোটেও সোজা নয়। কারণ ফ্রিল্যান্সিং “একটা চাকরি” না—এটা একটা লং-টার্ম ক্যারিয়ার। এখানে শুধু স্কিল শিখলেই হয় না; আপনার ব্যক্তিত্ব, ধৈর্য, কাজের ধরন, চাপ নেওয়ার ক্ষমতা, ক্লায়েন্ট হ্যান্ডেলিং—সব কিছুর সমন্বয় লাগে।
আর ২০২৬ সালে এসে আরও একটা বড় ফ্যাক্টর যোগ হয়েছে—AI।
অনেক কাজ AI টুলস দিয়ে দ্রুত হয়ে যাচ্ছে, ফলে কিছু পুরোনো কাজের ডিমান্ড কমছে, আবার নতুন নতুন কাজ জন্ম নিচ্ছে। তাই “কোন কাজ শিখব” প্রশ্নটা এখন আগের চেয়ে আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
অর্থাৎ উত্তরটা মোটেও ততটা সরল নয়। এই প্রশ্নের ভুল উত্তরের কারণেই হাজার হাজার তরুণ ফ্রিল্যান্সিং শুরু করার ৬ মাসের মাথায় ঝরে পড়ে। তারা হতাশ হয়ে ল্যাপটপ বন্ধ করে দেয় এবং সারা জীবনের জন্য এই সেক্টরকে বিদায় জানায়।
আজকের এই ব্লগে আমি আমার নিজের জীবনের একটি ব্যর্থতা এবং সেখান থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প বলব। সাথে শেয়ার করব জাপানিজদের বিশ্বখ্যাত ‘ইকিগাই’ (Ikigai) মেথড এবং ফাইভার মার্কেটপ্লেস রিসার্চের গোপন সূত্র—যা ব্যবহার করে আপনি নিজেই বের করতে পারবেন আপনার জন্য ‘পারফেক্ট’ স্কিল কোনটি।
পর্ব ১: আমার ফ্রিলান্সিং ক্যারিয়ার শুরুর গল্প
অনেকেই হয়তো আমাকে একজন গ্রাফিক ডিজাইন মেন্টর বা ডিজাইনার হিসেবে চেনেন। কিন্তু আপনারা কি জানেন, আমার ফ্রিল্যান্সিং ক্যারিয়ারের শুরুটা মোটেও ডিজাইনিং দিয়ে ছিল না?
আমার যাত্রা শুরু হয়েছিল একজন ‘ওয়েব ডেভেলপার’ হিসেবে। তখন চারদিকে কোডিংয়ের খুব নামডাক। সবাই বলছিল, “ওয়েব ডেভেলপমেন্ট শিখলে ভবিষৎ উজ্জ্বল, অনেক টাকা।” আমিও সেই স্রোতে গা ভাসালাম।
শুরুতে এইচটিএমএল (HTML), সিএসএস (CSS) শিখতে বেশ মজাই লাগত। রঙ পাল্টাচ্ছে, বাটন নড়াচড়া করছে—বেশ একটা জাদুকরী ব্যাপার। কিন্তু বিপত্তিটা বাঁধল যখন আমি অ্যাডভান্সড লেভেলে গেলাম এবং রিয়েল লাইফ প্রোজেক্ট বা ইন্ডাস্ট্রির ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করলাম।
তখন আর কাজটা আমার কাছে ‘মজা’ মনে হতো না, মনে হতো এক বিশাল বোঝা। বিশেষ করে ডিবাগিং (Debugging) বা কোডের ভুল ধরার সময়টা ছিল আমার জন্য বিভীষিকা।
একটা ছোট্ট উদাহরণ দিই। ঘণ্টার পর ঘণ্টা কোড লিখেছি, কিন্তু রান করার পর দেখা গেল পুরো সাইট ভেঙে গেছে বা এরর দেখাচ্ছে। আমি হন্যে হয়ে খুঁজছি ভুলটা কোথায়। মাথার চুল ছিঁড়ছি, কফি খাচ্ছি, কিন্তু ভুল আর পাই না। অবশেষে ৩-৪ ঘণ্টা পর আবিষ্কার করলাম—পুরো কোড ঠিকই ছিল, শুধু একটি লাইনের শেষে ছোট্ট একটি ‘কমা’ (,) বা সেমিকোলন দিতে ভুল করেছি!
মাত্র একটা কমা! এর জন্য আমার জীবনের মূল্যবান ৪টি ঘণ্টা নষ্ট হলো।
ফলাফলস্বরূপ, আমার ভেতরে এক ধরনের বিরক্তি চলে এল। আমি বুঝতে পারলাম, এই ইন্ডাস্ট্রিতে প্রচুর টাকা আছে, ডলারের হাতছানি আছে, কিন্তু কাজটা করে আমি শান্তি পাচ্ছি না। ল্যাপটপ অন করলেই আমার মেজাজ খিটখিটে হয়ে যেত।
এখন এই জায়গাটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ:
আপনি যদি এমন কোনো কাজ বেছে নেন যেটাতে টাকা আছে কিন্তু কাজটা করতে আপনার ভালো লাগে না—তাহলে দিনশেষে আপনি দুইভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত হবেন:
- কাজ করতে করতে আপনি মানসিকভাবে ক্লান্ত হয়ে যাবেন
- ধারাবাহিকভাবে শেখা/আপডেট থাকা সম্ভব হবে না
- আপনি মাঝপথে থেমে যাবেন
- ফলে “টাকা আছে” হলেও বাস্তবে আপনার আয় দাঁড়াবে শূন্যের কাছাকাছি
পর্ব ২: টাকা বনাম মানসিক প্রশান্তি—কোনটি আগে?

আমার সেই ওয়েব ডেভেলপমেন্ট ক্যারিয়ারের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আমি নিজেকে একটি কঠিন প্রশ্ন করলাম।
“অজয়, এই ইন্ডাস্ট্রিতে অনেক টাকা আছে। কিন্তু কাজটা করতে তোমার ভালো লাগে না। তুমি কি পারবে আগামী ১০-২০ বছর প্রতিদিন ৮-১০ ঘণ্টা এই বিরক্তিকর কাজটা করে যেতে?”
উত্তরটা ছিল— “না।”
যদি আমি জোর করে কাজটা করতাম, হয়তো মাসের শেষে আমার পকেটে অনেক টাকা থাকত। কিন্তু সেই টাকা ভোগ করার মতো মানসিক অবস্থা আমার থাকত না। আমি হতাম একজন ধনী কিন্তু অসুখী ফ্রিল্যান্সার। আর ফ্রিল্যান্সিং মানেই তো স্বাধীনতা (Freedom)। যদি কাজের মধ্যেই আনন্দ না থাকে, তবে সেই স্বাধীনতার মানে কী?
এই সহজ সত্যটা আমি খুব দ্রুত বুঝতে পেরেছিলাম (ভাগ্যক্রমে)। প্রায় ৬ মাস থেকে ১ বছরের মাথায় আমি আমার ক্যারিয়ারের মোড় সম্পূর্ণ ঘুরিয়ে ফেলি। আমি কোডিং ছেড়ে চলে আসি ‘গ্রাফিক ডিজাইন’ ইন্ডাস্ট্রিতে।
এখানে এসে আমি অদ্ভুত এক আনন্দ পেলাম। একটা সাদা ক্যানভাসে রঙ দিয়ে কিছু তৈরি করা, ফন্ট নিয়ে খেলা করা—এই কাজগুলো করার সময় আমার সময়ের জ্ঞান থাকত না। কখন রাত কেটে সকাল হয়ে যেত, আমি বুঝতেই পারতাম না। আর যেহেতু কাজটা আমার ভালো লাগত, তাই আমি খুব দ্রুত শিখতে পারলাম এবং ক্লায়েন্টদের ভালো সার্ভিস দিতে পারলাম। আজকের এই অবস্থান সেই ভালো লাগারই ফসল।
শিক্ষা:
আমার এই ছোট্ট ঘটনা থেকে আপনারা কী বুঝলেন?
কোন ইন্ডাস্ট্রিতে টাকা বেশি—সেটা বিবেচ্য বিষয় নয়। তার চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো—কোন কাজটা করতে আপনার ভালো লাগে। কম্পিউটার স্ক্রিনের সামনে টানা ১০ ঘণ্টা বসে থাকার পরও যদি আপনার ক্লান্তি না আসে, বিরক্ত না লাগে—তবে বুঝবেন, সেই কাজটাই আপনার জন্য। সেটাই আপনার ফার্স্ট প্রায়োরিটি হওয়া উচিত।
ফ্রিল্যান্সিং ইন্ডাস্ট্রিতে ২০২৬ সালে টিকে থাকার জন্য আপনাকে চারটা বিষয় একসাথে মিলাতে হবে:
- ভালো লাগা (Interest)
- দক্ষতা গড়ে তোলার ক্ষমতা (Ability/Strength)
- মার্কেট ডিমান্ড (Demand)
- AI যুগে টিকে থাকার সম্ভাবনা (Future-proof)
এগুলোর যেকোনো একটা বাদ দিলে আপনি হয়তো শুরু করবেন, কিন্তু লম্বা দৌড়ে টিকবেন না।
পর্ব ৩: অন্যের সফলতাই আপনার গন্তব্য নয়
আমাদের দেশে একটা বড় সমস্যা হলো—আমরা ‘হুজুগে’ চলি। বড় ভাই কী করছে, পাশের বাসার ভাবীর ছেলে কী করে লাখ টাকা কামাচ্ছে—আমরা সেটা অন্ধের মতো কপি করার চেষ্টা করি।
ধরুন, আপনার পরিচিত এক বড় ভাই ৫ বছর আগে ‘ব্যাকগ্রাউন্ড রিমুভ’ (Background Removal)-এর কাজ করে মাসে ২০০০ ডলার আয় করতেন। তিনি সেটা দিয়ে বাড়ি-গাড়ি করেছেন। আপনি তাকে দেখে ভাবলেন, “ওরে বাবা! ব্যাকগ্রাউন্ড রিমুভে তো অনেক টাকা! আমিও এটাই শিখব।”
কিন্তু বাস্তবতা হলো, আপনি এখন আর ২০২৫-২৬ সালে এসে সেই কাজ দিয়ে ক্যারিয়ার গড়তে পারবেন না। কারণ?
১. প্রযুক্তি পরিবর্তন: এখন ক্যানভা (Canva) বা ফটোশপের এক ক্লিকেই ব্যাকগ্রাউন্ড রিমুভ করা যায়। এআই (AI) এই কাজটা সেকেন্ডে করে দিচ্ছে।
২. মার্কেট স্যাচুরেশন: ওই বড় ভাই যখন শুরু করেছিলেন, তখন কম্পিটিশন কম ছিল। এখন সেখানে লাখ লাখ মানুষ।
আপনি যদি আজ সেই বড় ভাইকে জিজ্ঞেস করেন, দেখবেন তিনিও আর এখন ব্যাকগ্রাউন্ড রিমুভের কাজ করছেন না। তিনি হয়তো এখন ‘এআই ইমেজ জেনারেশন’ বা ‘হাই-এন্ড রিটাচিং’-এর দিকে শিফট করেছেন। অর্থাৎ, তিনি সময়ের সাথে নিজেকে বদলেছেন।
আপনাকেও তাই করতে হবে। অন্যের অতীত সাফল্য দেখে নিজের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবেন না। আপনাকে বর্তমান ট্রেন্ড এবং নিজের ভালো লাগার সমন্বয় করতে হবে।
এখানে শিক্ষা হলো:
একটা কাজ এক সময় খুব লাভজনক ছিল বলে সেটা সারাজীবন লাভজনক থাকবে—এটা ধরে নেওয়া ভুল।
পর্ব ৪: সঠিক ক্যারিয়ার বাছতে ‘জাপানিজ ইকিগাই’ (Ikigai) মেথড

এখন প্রশ্ন হলো, হাজার হাজার স্কিলের ভিড়ে আপনি বুঝবেন কীভাবে যে কোনটি আপনার জন্য সঠিক? ওয়েব ডিজাইন, গ্রাফিক ডিজাইন, ডিজিটাল মার্কেটিং, নাকি ভিডিও এডিটিং?
এই কনফিউশন দূর করার জন্য আমি জাপানিজদের একটি চমৎকার ফর্মুলা বা মেথড আপনাদের শেখাব। এর নাম ‘ইকিগাই’ (Ikigai)। জাপানি ভাষায় এর অর্থ হলো— “বেঁচে থাকার কারণ” বা “Reason for being.”
ক্যারিয়ার নির্বাচনের ক্ষেত্রে ইকিগাই মেথড ৪টি বৃত্তের বা প্রশ্নের সমন্বয়ে কাজ করে। আপনি খাতা-কলম নিয়ে বসুন এবং এই ৪টি প্রশ্নের উত্তর বের করুন।
১. আপনি কী করতে ভালোবাসেন? (What you love)
এটা হলো আপনার প্যাশন। কোন কাজটা করলে আপনি সময়ের হিসাব ভুলে যান? সেটা হতে পারে আঁকাআঁকি, লেখালেখি, মানুষের সাথে কথা বলা, কিংবা গণিতের সমস্যা সমাধান করা।
- যদি আঁকাআঁকি ভালো লাগে -> গ্রাফিক ডিজাইন বা ইলাস্ট্রেশন হতে পারে।
- যদি লজিক বা সমস্যা সমাধান ভালো লাগে -> কোডিং বা প্রোগ্রামিং হতে পারে।
- যদি গল্প বলতে ভালো লাগে -> কন্টেন্ট রাইটিং বা ডিজিটাল মার্কেটিং হতে পারে।
“ভালো লাগে” কিভাবে বুঝবেন? (একটা ছোট্ট টেস্ট)
শুধু ভাবলেই হবে না। ভালো লাগা বুঝতে হয় টেস্ট করে।
আমি আপনাদের একটা সহজ টেস্ট দিচ্ছি:
- যে ৩টা স্কিল ভালো লাগে মনে হচ্ছে—লিস্ট করুন
- প্রত্যেকটা স্কিল নিয়ে ৭ দিনের “মাইক্রো প্রজেক্ট” করুন
- ৭ দিন শেষে দেখুন—কোনটার সময় সবচেয়ে দ্রুত কেটেছে?
- কোনটার বেলায় আপনি নিজে নিজে বেশি এক্সপ্লোর করতে গেছেন?
- কোনটার বেলায় সমস্যায় পড়েও আপনি ছাড়তে চাননি?
যেটা ছাড়তে মন চায় না—সেটাই আপনার স্কিল।
২. আপনি কোন কাজে দক্ষ? (What you are good at)
ভালোবাসলেই হবে না, সেই কাজে আপনার দক্ষতা থাকার সম্ভাবনা কতটুকু? ধরুন আপনার গান গাইতে ভালো লাগে, কিন্তু আপনার গলা সুরের সাথে মেলে না। সেক্ষেত্রে গান গেয়ে ক্যারিয়ার গড়া কঠিন। ফ্রিল্যান্সিংয়ের ক্ষেত্রে দেখুন, আপনি কি টেকনোলজি ব্যবহারে দক্ষ? আপনি কি দ্রুত টাইপ করতে পারেন? নাকি আপনার কালার সেন্স ভালো? নিজের ন্যাচারাল ট্যালেন্ট বা স্কিলগুলো খুঁজে বের করুন।
৩. পৃথিবী বা মার্কেটের কী প্রয়োজন? (What the world needs)
আপনার যা ভালো লাগে, তার কি আদৌ কোনো চাহিদা আছে? ধরুন, আপনার ‘ঘুড়ি ওড়াতে’ খুব ভালো লাগে এবং আপনি এতে খুব দক্ষ। কিন্তু ফ্রিল্যান্স মার্কেটপ্লেসে কি কেউ আপনাকে ঘুড়ি ওড়ানোর জন্য টাকা দেবে? সম্ভবত না।
আপনাকে দেখতে হবে, বর্তমানে বিশ্বের মানুষের বা ব্যবসার কোন সমস্যাগুলো সমাধান করা প্রয়োজন। ওয়েবসাইট দরকার, লোগো দরকার, ভিডিও এডিট করা দরকার—এগুলো মানুষের নিড (Need)।
৪. কোন কাজের জন্য মানুষ আপনাকে টাকা দেবে? (What you can be paid for)
চাহিদা থাকলেই হবে না, সেটা যথেষ্ট লাভজনক হতে হবে। এমন স্কিল বাছতে হবে যার বিনিময়ে ক্লায়েন্টরা ডলার খরচ করতে প্রস্তুত।
ম্যাজিক স্পট (The Sweet Spot):
যখন আপনি এমন একটি কাজ খুঁজে পাবেন—
- যা আপনার ভালো লাগে,
- যাতে আপনি দক্ষ হতে পারবেন,
- মার্কেটে যার প্রচুর চাহিদা আছে,
- এবং যার বিনিময়ে ভালো টাকা পাওয়া যায়।
—তখনই বুঝবেন আপনি আপনার ‘ইকিগাই’ বা পারফেক্ট ক্যারিয়ার খুঁজে পেয়েছেন।
পর্ব ৫: “কোন স্কিলের ডিমান্ড আছে?” — সবচেয়ে বাস্তব উপায়: Fiverr রিসার্চ (ধাপে ধাপে)

তাত্ত্বিক কথা অনেক হলো। এবার আসুন একদম হাতে-কলমে শিখি কীভাবে বুঝব কোন স্কিলটার চাহিদা এখন মার্কেটে বেশি এবং কোনটাতে কম্পিটিশন কম। এর জন্য সবচেয়ে সহজ এবং কার্যকর টুল হলো Fiverr.com।
এআই (AI) টুল বা চ্যাটজিপিটিকে জিজ্ঞেস করে আপনি কিছু ধারণা পেতে পারেন, তবে আমি বলব একটু কষ্ট করে নিজের চোখে মার্কেট যাচাই করুন। কারণ এআই আপনাকে ডাটা দেবে, কিন্তু মার্কেটের ‘পালস’ বা রিয়েল-টাইম অবস্থা বুঝতে হলে আপনাকে ফিল্ডে নামতে হবে।
নিচের ধাপগুলো অনুসরণ করুন:
ধাপ ১: ট্রেন্ডিং স্কিল খুঁজুন

ফাইভারের হোমপেজে যান। সেখানে মেনু বারে দেখবেন বিভিন্ন ক্যাটাগরি (Graphics, Programming, Digital Marketing ইত্যাদি)। সেখানে নতুন কোন সাব-ক্যাটাগরি যুক্ত হয়েছে কি না দেখুন। বিশেষ করে ‘AI Services’ সেকশনটি এখন হট কেক।
এছাড়াও সার্চ বক্সে গিয়ে জাস্ট ‘A’, ‘B’, ‘C’ টাইপ করুন, দেখবেন ফাইভার আপনাকে অটো-সাজেস্ট করছে মানুষ কী লিখে বেশি সার্চ করছে।
ধাপ ২: গিগ সংখ্যা বা কম্পিটিশন চেক করুন (Supply)
ধরুন আপনি ঠিক করলেন ‘Logo Design’ শিখবেন। ফাইভারে ‘Logo Design’ লিখে সার্চ দিন।
রেজাল্টের উপরে বাম পাশে দেখবেন লেখা আছে— “180,000+ services available”।
এর মানে হলো, এই একটি কাজের জন্য ১ লাখ ৮০ হাজার মানুষ দোকান খুলে বসে আছে। আপনি যদি আজ নতুন হিসেবে এখানে ঢোকেন, তবে কাজ পাওয়াটা হবে খড়ের গাদায় সুঁই খোঁজার মতো। অসম্ভব নয়, তবে অত্যন্ত কঠিন এবং ধৈর্যসাপেক্ষ।

ধাপ ৩: ডিমান্ড বা চাহিদা চেক করুন (Demand)
এবার অন্য একটি কিওয়ার্ড দিয়ে সার্চ দিন। ধরুন, ‘Youtube Thumbnail Design’।
দেখলেন গিগ আছে ২০,০০০। মানে লোগো ডিজাইনের চেয়ে কম্পিটিশন অনেক কম।
কিন্তু কম্পিটিশন কম দেখেই খুশি হওয়ার কারণ নেই। দেখতে হবে বায়াররা আদৌ এটা কিনছে কি না।
এর জন্য প্রথম পেজের ৫-১০ জন সেলারের গিগ ওপেন করুন। তাদের গিগের টাইটেলের নিচে বা ডানপাশে দেখবেন লেখা আছে— “5 orders in queue” বা “12 orders in queue”।
এর মানে হলো, এই মুহূর্তে তাদের হাতে ৫ বা ১২টি কাজ পেন্ডিং আছে।

গোল্ডেন ফর্মুলা:
যদি দেখেন—
- গিগ সংখ্যা (Supply): অনেক কম (৩০০০-৫০০০ এর নিচে)।
- অর্ডার ইন কিউ (Demand): অনেক বেশি (প্রত্যেকের হাতে ৫-১০টা করে কাজ আছে)।
- প্রাইস (Price): মোটামুটি ভালো (২০−৫০+)।
—বুঝে নেবেন, আপনি গুপ্তধনের সন্ধান পেয়েছেন! এই স্কিলটি শেখা আপনার জন্য নিরাপদ এবং লাভজনক।
ধাপ ৪: এআই (AI) ট্রেন্ড বিশ্লেষণ
বর্তমান যুগ এআই-এর যুগ। আপনি যে স্কিলই বাছুন না কেন (হোক সেটা গ্রাফিক ডিজাইন বা কন্টেন্ট রাইটিং), আপনাকে দেখতে হবে সেই স্কিলকে এআই রিপ্লেস করে দিচ্ছে কি না। অথবা, এআই ব্যবহার করে সেই কাজটা আরও দ্রুত করা যায় কি না।
যেমন: শুধু ‘আর্টকেল রাইটিং’ না শিখে যদি ‘AI Content Editing’ বা ‘Fact Checking’ শেখেন, তবে আপনার ভ্যালু বাড়বে।
AI ট্রেন্ড: ভয় পাবেন না—এটাকে নিজের অস্ত্র বানান
অনেকেই এখন ভয় পান—“AI সব কাজ নিয়ে নেবে।”
আমি বলব: AI যাদের কাজ নেবে, তারা হলো যারা একই ধরনের কাজ বারবার একইভাবে করে।
কিন্তু আপনি যদি এমন স্কিলে যান যেখানে লাগে:
- স্ট্র্যাটেজি
- গল্প বলা
- ব্র্যান্ড বোঝা
- কাস্টমার সাইকোলজি
- ক্রিয়েটিভ ডিরেকশন
তাহলে AI আপনার প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, আপনার সহকারী হবে।
উদাহরণ:
একজন ডিজাইনার যদি কেবল লোগো আঁকে—AI তাকে চাপে ফেলবে।
কিন্তু একজন ডিজাইনার যদি ব্র্যান্ড স্টোরি, ভিজ্যুয়াল সিস্টেম, কনসিসটেন্সি, অ্যাড ক্রিয়েটিভ—সব বোঝে, AI তাকে আরও দ্রুত কাজ করতে সাহায্য করবে।
পর্ব ৬: আমার চূড়ান্ত পরামর্শ
ফ্রিল্যান্সিং কোনো ১০০ মিটার স্প্রিন্ট দৌড় নয়, এটি একটি ম্যারাথন। এখানে জিততে হলে আপনাকে দীর্ঘ সময় দৌড়াতে হবে। আর দীর্ঘ সময় দৌড়ানোর জন্য আপনার ফুসফুসে জোর (দক্ষতা) এবং মনে আনন্দ (প্যাশন) দুটোই থাকতে হবে।
১. ভালো লাগাকে প্রাধান্য দিন: অন্যের লাখ টাকার স্ক্রিনশট দেখে প্রলুব্ধ হবেন না। নিজের কাছে সৎ থাকুন। যে কাজটা করতে আপনার ভালো লাগে, সেটার ওপর ফোকাস করুন।
২. রিসার্চ করুন: অন্ধের মতো কোনো কোর্স কিনবেন না। আগে ফাইভার, আপওয়ার্ক এবং ইউটিউব ঘেঁটে দেখুন সেই কাজের ভবিষ্যৎ কী।
৩. ধৈর্য ধরুন: আমি ওয়েব ডেভেলপমেন্ট ছেড়ে ডিজাইনে এসেছিলাম বলে আজ সফল। কিন্তু সেই শিফটিংয়ের সময়টা সহজ ছিল না। নতুন কিছু শিখতে সময় লাগে, নিজেকে সেই সময়টা দিন।
৪. লোভ সামলান: “ঘরে বসে মাসে ১ লাখ টাকা” টাইপ বিজ্ঞাপনে কান দেবেন না। স্টেবল ইনকাম করতে হলে আপনাকে এক্সপার্ট হতে হবে, আর এক্সপার্ট হতে সময় লাগে।
পরিশেষে বলব, আপনার ক্যারিয়ার আপনার হাতে। হুজুগে না মেতে, ইকিগাই মেথড এবং মার্কেট রিসার্চ কাজে লাগিয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিন। যদি কাজটি ভালোবেসে করতে পারেন, টাকা আজ হোক বা কাল—আসবেই।
পর্ব ৭: আপনার জন্য একটি ছোট্ট অ্যাকশন প্ল্যান (এখনই শুরু করুন)
আজকেই এই কাজগুলো করুন:
- Ikigai চার্ট বানান (৪টি প্রশ্নের উত্তর লিখুন)
- Fiverr-এ ১০টা স্কিল সার্চ করুন (AI + Traditional দুটোই)
- প্রতিটা স্কিলে গিগ সংখ্যা + অর্ডার কিউ + প্রাইস নোট করুন
- টপ ৩টা স্কিল বাছুন
- ৭ দিনের “মাইক্রো প্রজেক্ট” করে টেস্ট করুন
- যে স্কিলটা ভালো লাগে এবং মার্কেটে ডিমান্ড দেখছেন—সেটাতেই ৩ মাস ফুল ফোকাস দিন
হ্যাপি ফ্রিল্যান্সিং

আপনি যদি এখনো কনফিউজড থাকেন, একদম সহজ করে বলি—
আপনার ভালো লাগা + মার্কেট ডিমান্ড + AI ট্রেন্ড
এই তিনটা যেখানে মিলে যায়, সেখানেই আপনার ক্যারিয়ারের ভবিষ্যৎ।
#FreelanceSkill2026 #IkigaiMethod #FiverrResearch #AIFreelance #ChooseYourSkill #FreelancingBangladesh #PassionInFreelance #FutureProofCareer #GraphicDesignFreelance #FreelanceTipsBD #IkigaiFreelance #FreelanceCareerGuide
