লিখেছেন: কে.এস. অজয় (KS Ajay)
ফ্রিল্যান্সার হিসেবে কাজ করতে গিয়ে প্রতিদিন দেশ-বিদেশের নানা কাজের অভিজ্ঞতা তো হয়ই, কিন্তু সম্প্রতি পাসপোর্টে নিজের পেশা আপডেট করতে গিয়ে এক অন্যরকম অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হলাম। যে অভিজ্ঞতা আমাকে নতুন করে ভাবিয়েছে এবং একই সাথে উপলব্ধি করিয়েছে—আমাদের পেশাগত স্বীকৃতির লড়াইটা আসলে আমাদের নিজেদেরই শুরু করতে হবে।
১. পটভূমি: ছাত্রজীবন থেকে ফুল-টাইম ফ্রিল্যান্সিং
আমার আগের পাসপোর্টে পেশা হিসেবে দেওয়া ছিল ‘Student’ (শিক্ষার্থী)। দীর্ঘদিন ধরে গ্রাফিক ডিজাইন ও ফ্রিল্যান্সিং পেশায় কাজ করার পর যখন বর্তমান পাসপোর্ট রিনিউ ও পেশা পরিবর্তনের সময় এলো, তখন নিয়মানুযায়ী পেশার সপক্ষে প্রয়োজনীয় কাগজ জমা দেওয়ার প্রয়োজন হলো।
আমার উদ্দেশ্য ছিল স্পষ্ট—যে পেশায় দিনরাত মেধা ও শ্রম দিয়ে স্বাধীনভাবে বৈদেশিক মুদ্রা আয় করছি এবং দেশকে এগিয়ে নিচ্ছি, পাসপোর্টেও সেই প্রকৃত পেশাটিরই পরিচয় থাকবে।
২. দালালদের উদ্ভট পরামর্শ: ‘দোকানের কর্মচারী’ নাকি ‘বেকার’?
পাসপোর্ট সংক্রান্ত কাজকর্ম নিয়ে যারা অভিজ্ঞতা রাখেন তাদের সাথে আলোচনা করলাম। কিন্তু তাদের পরামর্শ শুনে আমি রীতিমতো অবাক হলাম! তারা আমাকে বললেন:
- হয় কোনো পরিচিত দোকানের কর্মচারী হিসেবে আবেদন করতে হবে (এবং সংশ্লিষ্ট দোকানের সিলসহ প্রত্যয়নপত্র জমা দিতে হবে),
- নতুবা আবেদনপত্রে পেশার ঘরে ‘Unemployed’ বা ‘বেকার’ লিখতে হবে!
এখন আমার প্রশ্ন হলো—আমি পেশা হিসেবে ফ্রিল্যান্সার কেন দেব না? কেন একজন আত্মনির্ভরশীল তরুণকে সরকারি নথিপত্রে নিজেকে ভুয়া কর্মচারী কিংবা বেকার পরিচয় দিতে হবে?
৩. সরকারি তালিকার সীমাবদ্ধতা ও ‘Others’ ক্যাটাগরির ভুল ধারণা
অনলাইন আবেদন ফর্মে গিয়ে দেখলাম, পেশার ড্রপডাউন লিস্টে ‘Freelancer’ বা ‘ফ্রিল্যান্সিং’ অপশনটি অন্তর্ভুক্ত নেই। পরবর্তীতে চাইলাম তাহলে ‘Self-Employed’ (স্ব-নিয়োজিত) দেব—দুঃখের বিষয় সেটাও তালিকায় নেই।
কোনো সুনির্দিষ্ট অপশন খুঁজে না পেয়ে অবশেষে বাধ্য হয়ে পেশার ঘরে ‘Others’ (অন্যান্য) সিলেক্ট করলাম।
কাগজপত্র জমা দেওয়ার জন্য যখন রাজবাড়ী পাসপোর্ট অফিসে গেলাম, কাউন্টারের দায়িত্বরত কর্মকর্তা প্রথমেই আমাকে জানালেন—‘Others’ অপশনটি শুধুমাত্র অসহায়, যাদের অল্প বয়সে বাবা-মা নেই বা এতিম এবং যাদের কোনো কিছু করার ক্ষমতা নেই, কেবল তাদের জন্যই বরাদ্দ।
আমি তাকে বললাম, “আমি তো বেকারও না, আবার ‘Others’ এর মধ্যেও পড়ি না। আমি স্বাবলম্বী একজন ফ্রিল্যান্সার। তাহলে আমি কী করব?”
তিনি তখন আমাকে আবেদনপত্র সংশোধন করে ‘বেকার’ দিয়ে নতুন করে আবেদন করার পরামর্শ দিলেন।
৪. আপস না করে পরিচালকের মুখোমুখি
কাগজ ফেরত নিয়ে এক মুহূর্তের জন্য ভাবছিলাম—ঝামেলা এড়াতে বেকার দিয়েই কি তবে জমা দেব? কিন্তু পরক্ষণেই মনে হলো, সমস্যা যেহেতু আমার নয়, এটা সিস্টেমের একটি ঘাটতি এবং এর একটি সুষ্ঠু সমাধান অবশ্যই থাকা উচিত।
তাই আপস না করে কথা বলতে সোজা চলে গেলাম পাসপোর্ট অফিসের পরিচালক (Director) স্যারের রুমে।
পরিচালক স্যার অত্যন্ত মনোযোগ সহকারে আমার পুরো বিষয়টি শুনলেন। এরপর তিনি আমার সামনেই নিজের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে (Higher Authority) ফোন করলেন।
ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের উত্তর:
তারা জানালেন যে, এমন বিষয় মাঝে মধ্যেই সামনে আসছে। সরকারি ড্রপডাউন তালিকায় ‘ফ্রিল্যান্সার’ পেশাটি আনুষ্ঠানিকভাবে সংযুক্ত করার কাজও প্রক্রিয়াধীন। তবে ফ্রিল্যান্সারদের অবশ্যই নিজেদের উদ্যোগী হতে হবে এবং প্রমাণপত্র হিসেবে সরকারি ফ্রিল্যান্সার আইডি কার্ড (Freelancer ID Card) দেখাতে হবে।
৫. কলম দিয়ে লিখে দেওয়া সমাধান
তাহলে আমার বর্তমান আবেদনের কী হবে?
ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা মোতাবেক পরিচালক স্যার আমাকে বললেন—আবেদনপত্রে পেশার জায়গায় নিজ হাতে কলম দিয়ে ‘Freelancer’ লিখে পাশে একটি স্বাক্ষর করে দিতে।
স্যারের নির্দেশনা অনুযায়ী পেশার পাশে কলম দিয়ে ‘Freelancer’ লিখে ও স্বাক্ষর করে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ জমা দিলাম। আবেদনটি কোনো ঝামেলা ছাড়াই সফলভাবে গৃহীত হলো।
৬. বাংলাদেশের সকল ফ্রিল্যান্সার বন্ধুদের প্রতি আমার বার্তা
এই পেশায় যারা আছেন, তারা প্রায়ই এই ধরনের বিড়ম্বনার মুখে পড়েন। সরকারি ওপর মহল পর্যন্ত অনেকেই এই বিষয়টি জানেন। কিন্তু সরকারি ড্রপডাউন লিস্টে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘ফ্রিল্যান্সার’ পেশার স্থায়ী অন্তর্ভুক্তি আরও দ্রুত হবে তখনই—যখন অধিকাংশ ফ্রিল্যান্সার নিজের পেশাকে সম্মান জানিয়ে এটি ব্যবহারে সচেষ্ট হবেন।
পেশা হিসেবে ‘ফ্রিল্যান্সার’ লিখতে সংকোচ নয়—গর্ব করে লিখুন!
আমরা যে কাজ করছি তা শুধু আমাদের স্বাবলম্বী করছে না, বরং দেশের অর্থনীতিকেও সমৃদ্ধ করছে। তাই যেকোনো সরকারি নথিতে নিজের পরিচয় লুকিয়ে বেকার বা কর্মচারী না লিখে, গর্বের সাথে নিজের আসল পেশাটি তুলে ধরুন।

